আমীর চারু , বোয়ালমারী (ফরিদপুর): মসজিদে ইমামতি, মুসল্লিদের নামাজ পড়ানো ও ধর্মীয় দায়িত্ব পালন। এরপর হাতে কফির ফ্লাস্ক নিয়ে পথে বেরিয়ে পড়া। কখনো বাজারের অলিগলি, কখনো বিভিন্ন ব্যস্ত স্থানে দাঁড়িয়ে কফি বিক্রি ,এভাবেই নিজের সংসারের বাড়তি আয়ের ব্যবস্থা করেছেন ফরিদপুরের বোয়ালমারীর ইমাম মো. হাবিবুল্লাহ।
ধর্মীয় দায়িত্বের পাশাপাশি শ্রমকে সম্মানের চোখে দেখে হালাল পথে উপার্জনের এই চেষ্টা স্থানীয় মানুষের মধ্যে ইতোমধ্যে প্রশংসা তৈরি করেছে।
মো. হাবিবুল্লাহর বাড়ি বাগেরহাটের মোড়লগঞ্জ উপজেলার সোনাতোলী গ্রামে। ফাজিল পাস করার পর জীবিকার সন্ধানে প্রায় আট বছর আগে তিনি বোয়ালমারীতে আসেন। প্রথমে শেখর গ্রামের বোর্ড অফিস মসজিদে ইমাম হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরে পাশের দুর্গাপুর গ্রামের একটি মসজিদে ইমামতির দায়িত্ব নেন। স্ত্রী ও তিন সন্তান নিয়ে তার সংসার। মসজিদ থেকে পাওয়া সম্মানী দিয়ে পরিবারের সব খরচ মেটানো কঠিন হয়ে পড়ায় বিকল্প আয়ের পথ খুঁজছিলেন তিনি।
শেষ পর্যন্ত কফি বিক্রির ছোট্ট ব্যবসাকেই বেছে নেন হাবিবুল্লাহ।প্রতিদিন সকাল থেকে দুপুরের আগ পর্যন্ত বোয়ালমারী বাজার ও আশপাশের এলাকায় ঘুরে কফি বিক্রি করেন তিনি। তবে যোহরের নামাজের সময় হওয়ার আগেই তাকে মসজিদে ফিরতে হয়। তাই ইমামতির দায়িত্বে কোনো ব্যাঘাত না ঘটিয়েই সময় ভাগ করে নিয়েছেন।
তার পোশাকও ক্রেতাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। সৌদি আরবের ঐতিহ্যবাহী পোশাকের আদলে পোশাক, মাথায় ক্যাপ, হাতে গ্লাভস এবং বুকে একাধিক পকেটের জ্যাকেট। সঙ্গে থাকে ইলেকট্রিক কফি মেকার। জ্যাকেটের বিভিন্ন পকেটে রাখা থাকে কফি, কফিমেট, চিনি ও গরম পানির ফ্লাস্ক।
হাবিবুল্লাহর কাছে এক কাপ দুধ কফির দাম ২০ টাকা, ব্ল্যাক কফি ১০ টাকা। একটি ফ্লাস্কের গরম পানি দিয়ে তিনি প্রায় ৬০ থেকে ৭০ কাপ কফি তৈরি করতে পারেন। আবহাওয়া ভালো থাকলে এক থেকে দুই ঘণ্টার মধ্যেই কফি শেষ হয়ে যায়। সব খরচ বাদ দিয়ে দিনে গড়ে প্রায় ৩০০ টাকা তার হাতে থাকে।
হাবিবুল্লাহ বলেন, মসজিদ থেকে পাওয়া সম্মানী দিয়ে সংসারের প্রয়োজন মেটানো কঠিন হয়ে পড়েছিল। তাই নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী হালাল পথে উপার্জনের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তার ভাষায়, কোনো বৈধ কাজই ছোট নয়।
কফি বিক্রির সময় মুখে মাস্ক ব্যবহারের কারণও জানিয়েছেন তিনি। বলেন, নিজের স্বাস্থ্য সুরক্ষার পাশাপাশি মুসল্লিদের কথাও তিনি বিবেচনা করেন। তাদের যেন কোনো ধরনের অস্বস্তি না হয়, সেটিও তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ।
পৌর বিএনপির সহসভাপতি খান আতাউর রহমান বলেন, ইমাম-মুয়াজ্জিনসহ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের জীবনমান উন্নয়নে রাষ্ট্রীয় তহবিল থেকে মাসিক সম্মানি ও উৎসব ভাতা প্রদানের একটি সুনির্দিষ্ট প্রকল্প বাস্তবায়ন শুরু করেছে সরকার । তার মতে, এ ধরনের ব্যবস্থা কার্যকর হলে ধর্মীয় দায়িত্ব পালনকারীদের আর্থিক চাপ কমবে।
যুবদল নেতা রাসেল আহমেদ বলেন, ইমাম হাবিবুল্লাহ দেখিয়েছেন, আত্মমর্যাদা বজায় রেখে পরিশ্রমের মাধ্যমে অতিরিক্ত আয় করা সম্ভব। তার এই উদ্যোগ অন্য ইমাম-মুয়াজ্জিনদেরও অনুপ্রাণিত করতে পারে।
বোয়ালমারী উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সঞ্জয় সাহা বলেন, হাবিবুল্লাহর তৈরি কফি তিনি পান করেছি এবং ভালো লেগেছে। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালনকারীদের অনেকেই সীমিত সম্মানীতে জীবনযাপন করেন। সে কারণে হালাল পথে অতিরিক্ত আয়ের এমন উদ্যোগ অন্যদেরও উৎসাহিত করতে পারে।
ধর্মীয় দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি সম্মানজনক ও হালাল উপার্জনের এই গল্প শুধু একজন ইমামের ব্যক্তিগত সংগ্রামের কাহিনি নয়; এটি দেশের অসংখ্য স্বল্প-সম্মানীভোগী ইমাম-মুয়াজ্জিনের নীরব বাস্তবতারও প্রতিচ্ছবি। সমাজের বিভিন্ন স্তর থেকে তাদের ন্যায্য সম্মানী নিশ্চিত করার দাবি যেমন রয়েছে, তেমনি আত্মমর্যাদা অটুট রেখে পরিশ্রমের মাধ্যমে জীবিকা অর্জনের এই বার্তাও অনেকের কাছে হতে পারে অনুপ্রেরণার উৎস।
Leave a Reply