বোয়ালমারী প্রতিনিধি : ফরিদপুরের বোয়ালমারী সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে ৫ শতাধিক শিক্ষার্থীর পাঠদান চলছে মাত্র তিনজন নিয়মিত শিক্ষক দিয়ে। এর মধ্যে একজন শিক্ষক বিএড প্রশিক্ষণে। অনুমোদিত ১২টি শিক্ষক পদের মধ্যে শূন্য রয়েছে ৯টি। পরিস্থিতি সামাল দিতে চারজন খণ্ডকালীন শিক্ষক দিয়ে কোনো রকমে চলছে পাঠদান কার্যক্রম। এতে ব্যাহত হচ্ছে নিয়মিত শ্রেণি কার্যক্রম এবং শিক্ষার স্বাভাবিক পরিবেশ।
বিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, উপজেলা সদরের দক্ষিণ শিবপুর মহল্লায় প্রায় দেড় একর জমির ওপর ১৯৬৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় বিদ্যালয়টি। ১৯৮৭ সালের ২২ ডিসেম্বও প্রতিষ্ঠানটি জাতীয়করণ করা হয়। জাতীয়করণের সময় প্রধান শিক্ষক ও সহকারী প্রধান শিক্ষকসহ শিক্ষকের অনুমোদিত পদ ছিল ১১টি। পরে আইসিটি বিষয়ের আরও একটি শিক্ষক পদ যুক্ত হয়। সব মিলিয়ে শিক্ষক পদ দাঁড়ায় ১২টি।
বর্তমানে প্রধান শিক্ষক ও শরীরচর্চা ও ক্রীড়া শিক্ষকসহ নিয়মিত শিক্ষক রয়েছেন তিনজন। ইংরেজি বিষয়ের একজন শিক্ষক বিএড প্রশিক্ষণে থাকায় কার্যত নিয়মিত পাঠদানে শিক্ষকসংকট আরও প্রকট হয়ে উঠেছে। বিজ্ঞান, গণিত, ইংরেজি, বাংলা ও ধর্ম বিষয়ে সহকারী শিক্ষকের পদ শূন্য রয়েছে। বাধ্য হয়ে চারজন খণ্ডকালীন অতিথি শিক্ষক দিয়ে পাঠদান চালু রাখা হয়েছে।
শিক্ষকসংকটের পাশাপাশি দাপ্তরিক জনবল সংকটও রয়েছে বিদ্যালয়টিতে। তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির অনুমোদিত চারটি পদের বিপরীতে বর্তমানে কর্মরত রয়েছেন মাত্র একজন নৈশপ্রহরী। ২০১৫ সাল থেকে অফিস সহকারী এবং ২০২১ সাল থেকে দপ্তরি পদ শূন্য রয়েছে। নেই কোনো আয়া বা পরিচ্ছন্নতাকর্মী। নৈশপ্রহরী মোহাম্মদ মাসুদুল ইসলামকে দিয়ে অফিসের দাপ্তরিক ও কম্পিউটারের কাজ করানো হচ্ছে।
শিক্ষকসংকটের পাশাপাশি কর্মচারীর সংকটও রয়েছে বিদ্যালয়টিতে। তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির অনুমোদিত চারটি পদের বিপরীতে বর্তমানে কর্মরত রয়েছেন মাত্র একজন নৈশপ্রহরী। ২০১৫ সাল থেকে অফিস সহকারী এবং ২০২১ সাল থেকে দপ্তরি পদ শূন্য রয়েছে। নেই কোনো আয়া বা পরিচ্ছন্নতাকর্মী।
বিদ্যালয় সূত্র আরও জানায়, জেএসসি ও এসএসসি পরীক্ষার সমন্বিত কেন্দ্র হিসেবে নির্মিত ছয়তলা ভবনটিতে বর্তমানে বিদ্যালয়ের পাঠদান চলছে। অন্যান্য ভবনগুলো বোর্ড পরীক্ষার সময় ব্যবহার করা হলেও বাকি সময় পরিত্যক্ত থাকে। কর্তৃপক্ষ জানায়, পরিচ্ছন্নতাকর্মী না থাকায় ভবন ও এর আশপাশের পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। কয়েকটি শৌচাগারের অবস্থাও নাজুক বলে জানায় তারা।
এক সময় নারী শিক্ষায় সুনাম থাকা প্রতিষ্ঠানটিতে শিক্ষকসংকট ও পাঠদানের নানা সীমাবদ্ধতার কারণে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিদ্যালয়টিতে ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত বর্তমানে ৫ শতাধিক ছাত্রী পড়াশোনা করছে।
বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্রী অনিকা সরকার জানায়, শিক্ষক না থাকায় উচ্চতর গণিতের ক্লাস নিয়মিত হয় না। বিজ্ঞানাগার থাকলেও শিক্ষক সংকটের কারণে দীর্ঘদিন ধরে সেখানে ব্যবহারিক কার্যক্রম হচ্ছে না।
ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী তাসনিম মৃধা জানায়, শিক্ষক সংকটের কারণে নিয়মিত ক্লাস ব্যাহত হয়। ঘাটতি পূরণে তাদের বাইরে প্রাইভেট পড়তে হচ্ছে।
ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী জান্নাতির অভিভাবক আব্দুল গফফার মোল্যা বলেন, ‘সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক সংকট দ্রুত নিরসন করা প্রয়োজন। শিক্ষক সংকটের কারণে আমাদের সন্তানদের পড়াশোনা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে না।’
খণ্ডকালীন শিক্ষক বিউটি পারভীন বলেন, সারা মাস পাঠদান শেষে বিদ্যালয় থেকে সামান্য সম্মানী দেওয়া হয়। বর্তমান দ্রব্যমূল্যের বাজারে এই সম্মানী অত্যন্ত কম।
বিদ্যালয়ের শরীরচর্চা ও ক্রীড়া শিক্ষক মাসুদুল ইসলাম বলেন, ‘১২ জন শিক্ষকের কাজ সামলাতে খণ্ডকালীন চারজন শিক্ষক, আমি ও প্রধান শিক্ষকসহ মোট ছয়জনকে প্রতিদিন একাধিক পিরিয়ড নিতে হচ্ছে। একটি ক্লাস শেষ করেই আরেকটি ক্লাসে যেতে হয়। ফলে পাঠদানের প্রস্তুতির জন্য প্রয়োজনীয় সময় পাওয়া যায় না। এতে কাঙ্ক্ষিত মানের পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে।’
বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক সুকান্ত চন্দ্র মণ্ডল বলেন, ‘চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে এখানে যোগদানের পরই শিক্ষক-কর্মচারীর সংকটের বিষয়টি লিখিতভাবে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) ঢাকা অঞ্চলের উপপরিচালককে জানিয়েছি। জানিয়েছি স্থানীয় সংসদ সদস্য ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইউএনও মহোদয়কে কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যায়নি।’
তিনি বলেন, সরকারি কোনো বরাদ্দ না থাকায় স্থানীয়ভাবে তহবিল সংগ্রহ করে অতিথি খণ্ডকালীন শিক্ষকদের সামান্য সম্মানী দেওয়া হচ্ছে। বিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখতে দ্রুত শূন্য পদে শিক্ষক ও কর্মচারী নিয়োগের দাবি জানান তিনি।
বোয়ালমারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এস এম রকিবুল হাসান বলেন, ‘বিষয়টি জানার পর সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তর ও প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরকে জানিয়েছি। শিক্ষক-সংকট নিরসনে আমার পক্ষ থেকে চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। আশা করছি, শিগগিরই শূন্য পদে শিক্ষক দেওয়া হবে এবং বিদ্যালয়ের শিক্ষার পরিবেশ আরও উন্নত হবে।’
স্থানীয়রা জানিয়েছেন, বিদ্যালয়টি সরকারি হওয়ার আগে কোনো শিক্ষক-কর্মচারী সংকট ছিলো না। পড়ালেখার মানও সন্তোষজনক ছিলো। কিন্তু জাতীয়করণের পর শিক্ষক সংকট তীব্র হওয়ায় উপজেলার একমাত্র সরকারি বালিকা বিদ্যালয়টিতে পড়ালেখার মান তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে।স্থানীয় শিক্ষানুরাগী ও অভিভাবকদের দাবি মাধ্যমিক নারী শিক্ষার স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠানটিকে রক্ষা ও নারী শিক্ষার মানোন্নয়নে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও সরকার দ্রুত কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করার।
Leave a Reply